
অনিরাপদ খাদ্যে বছরে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি: নতুন প্রজন্ম সবচেয়ে ঝুঁকিতে, সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
ঢাকা, ১৩ জুন ২০২৬:
খাদ্যবাহিত রোগের কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১.২ শতাংশের সমান। (WHO)-এর সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদনের আলোকে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ ফুড সেফটি ফাউন্ডেশন (বিএফএসএফ) আয়োজিত “ফাস্ট ফুড, স্ট্রিট ফুড এন্ড ফুড সেফটি: ব্যালান্সিং কালচারাল টেস্ট উইথ হেলথ রিস্ক ইন মডার্ন ইটিং হ্যাবিট” শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য তুলে ধরেন।
সেমিনারে জানানো হয়, এই অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে সরাসরি চিকিৎসা ব্যয় প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার, আর উৎপাদনশীলতা হ্রাসজনিত ক্ষতি মোট ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে প্রায় ২৯ শতাংশ শিশু এ ধরনের খাদ্যজনিত রোগে আক্রান্ত।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ ফুড সেফটি ফাউন্ডেশনের মহাসচিব মুশতাক হাসান মুহঃ ইফতিখার বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যা মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ এটমিক এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ড. মাহাতবউদ্দিন। তিনি বলেন, আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে ফাস্ট ফুড ও আল্ট্রা-প্রসেসড খাবারের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। এসব খাবারে ব্যবহৃত মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট (এমএসজি) এবং প্লাস্টিক প্যাকেজিং থেকে নির্গত বিসফেনল-এ (বিপিএ) মানবদেহে কিডনি রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি বাড়ায়।
রাসায়নিক দূষণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শামস জানান, গবেষণায় দেখা গেছে ১২ বছরের কম বয়সী অসুস্থ শিশুদের রক্তে সিসা ও ক্যাডমিয়ামের উচ্চমাত্রা পাওয়া যাচ্ছে, যা কিডনি বিকল হওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও অতিরিক্ত কীটনাশক ও সারের ব্যবহার এবং “উত্তম কৃষি চর্চা”র অভাবে নিরাপদ খাদ্যের চ্যালেঞ্জ এখনও প্রকট।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ডেটা-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ঝুঁকি-ভিত্তিক নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে। বর্তমানে ১১ লাখের বেশি খাদ্য ব্যবসায়ীর একটি ডেটাবেস তৈরি করা হচ্ছে, যা লাইসেন্সিং ও তদারকি কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করবে। তিনি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সক্ষমতা বাড়াতে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের সরাসরি নিয়োগ বা “ল্যাটারাল এন্ট্রি”র ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
খাদ্য সচিবের প্রতিনিধি হিসেবে অতিরিক্ত সচিব শাহ আব্দুল আলিম খান বলেন, সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ালেও এককভাবে কোনো সংস্থার পক্ষে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ জন্য উৎপাদক, বিক্রেতা ও ভোক্তাদের সম্মিলিত দায়িত্ব পালন জরুরি। তিনি নতুন প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে শিক্ষাক্রমে নিরাপদ খাদ্য বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।
সেমিনার শেষে একটি ঘোষণা প্রদান করা হয়, যেখানে নিরাপদ খাদ্যকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়। ঘোষণায় ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বৃদ্ধি, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ এবং খাদ্যের উৎস শনাক্তকরণ (ট্রেসেবিলিটি) নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

আয়োজকরা সতর্ক করে বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় এখনই বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে এর জন্য আরও বড় মূল্য দিতে হবে।” অনুষ্ঠানে ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা ‘নিরাপদ খাদ্য কথন’-এর দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করা হয়।