
বেসরকারি চাকরিজীবীদের সুরক্ষায় সার্ভিস রুলস প্রণয়নে এগোচ্ছে সরকার: বিআইএমে আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত
ঢাকা, ১০ জুন ২০২৬
দেশের বেসরকারি খাতে কর্মরত লাখো চাকরিজীবীর অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা এবং ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সমন্বিত ‘বেসরকারি সার্ভিস রুলস’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই লক্ষ্যে রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইএম)-এ “বেসরকারি সার্ভিস রুলস: আন্তর্জাতিক চর্চা ও করণীয়” শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার (১০ জুন) সকালে বিআইএম-এর ১০০২ নম্বর কক্ষে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও বিআইএম-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে সরকারের নীতিনির্ধারক, গবেষক, শিল্প উদ্যোক্তা এবং শ্রম আইন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইএম-এর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. সলিম উল্লাহ। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি) মো. মোস্তফা জামান।
বক্তারা জানান, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একটি সার্ভিস রুলস প্রণয়নের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরির লক্ষ্যে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। আজকের এই সেমিনার সেই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সেমিনারে আন্তর্জাতিক শ্রমব্যবস্থা ও উত্তম চর্চা বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইএম-এর সহযোগী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা সুমাইয়া আক্তার কেয়া এবং গবেষণা কর্মকর্তা জাকিয়া রহমান। প্রবন্ধে বাংলাদেশসহ ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, চীন ও ভিয়েতনামের শ্রম আইন ও ব্যবস্থাপনার তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে কর্মঘণ্টা, মজুরি কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় ভিন্নতা থাকলেও শ্রমিক অধিকার রক্ষায় কার্যকর কাঠামো বিদ্যমান। বিশেষ করে মালয়েশিয়া সামাজিক নিরাপত্তা ও হয়রানি প্রতিরোধে অগ্রগামী, থাইল্যান্ড শ্রমিক সুরক্ষা ও অভিবাসী ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করছে এবং শ্রীলঙ্কায় চাকরিচ্যুতি ও অবসর সুবিধা সংক্রান্ত শক্তিশালী আইন রয়েছে।
এছাড়া ভারত সাম্প্রতিক শ্রম কোড সংস্কারের মাধ্যমে আইনের একীকরণ করেছে, চীন কর্মসংস্থান চুক্তি ও সামাজিক বীমায় গুরুত্ব দিয়েছে এবং ভিয়েতনাম কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সমষ্টিগত দরকষাকষির সুযোগ বাড়িয়েছে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা ন্যায্য বেতন-ভাতা, চাকরির নিরাপত্তা, পদোন্নতি ও ছুটির মতো মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বেসরকারি খাতে এখনো কোনো অভিন্ন সার্ভিস রুলস নেই।
প্রস্তাবিত সার্ভিস রুলসে ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ, নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট, উৎসব বোনাস, ভাতা, নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা, চাকরির স্থায়ীকরণ, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ছুটি ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা বিধান, দুর্নীতি প্রতিরোধ, চাকরিচ্যুতির নীতিমালা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. গাজী সাইফুজ্জামান, শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। তারা বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সার্ভিস রুলস প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শেষে সমাপনী বক্তব্য ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিআইএম-এর ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা এবং সেমিনার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক এস. এম. আরিফুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের শ্রমবাজার আরও সুশৃঙ্খল, জবাবদিহিমূলক ও কর্মীবান্ধব হবে এবং বেসরকারি খাতের কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।