
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে ভাষার প্রশ্নটি গভীরভাবে যুক্ত। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ- সব ক্ষেত্রেই ভাষা তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও জাতীয় চেতনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
১৯৭৪ সালের অধিবেশনের আগেও ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব কুর্ট ভাল্ডহাইমের কাছে যুদ্ধবিদ্ধস্থ বাংলাদেশের নানান বিষয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু চিঠি লিখেন। তাদের কয়েকটি ঐতিহাসিক চিঠি আমার সংগ্রহে আছে।
যাই হোক। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় দেয়া প্রথম ভাষণ। জাতিসংঘের সরকারি কার্যবিবরণীতেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, “Sheikh Mujibur Rahman spoke in Bengali।” সেই সময় তাঁর প্রতিনিধিদল ইংরেজি সংস্করণ সরবরাহ করেছিল। ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে বাংলা ভাষা যে মর্যাদা লাভ করেছিল, বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ তার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
এখানে উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইংরেজি ছাড়াও আরও ৫টি ভাষায় স্থায়ী ভাবে বক্তৃতা দেওয়া হয়। সেগুলো হচ্ছে- আরবি, চীনা, ফরাসি, রুশ এবং স্প্যানিশ। তার ব্যাতিক্রম ঘটেছিলো- বঙ্গবন্ধুর ভাষণ।
বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার- তিনি কোন ভাষায় নিজে বক্তব্য দিয়েছেন এবং তাঁর বক্তব্যে কোন কোন ভাষার কথা উল্লেখ করেছেন, এই দুটি বিষয় এক নয়।
পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, পাকিস্তানের গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর ভাষা-সংক্রান্ত বক্তব্যের ইতিহাস এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর করাচিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে তিনি বাংলায় কথা বলার অধিকার নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেন। তিনি মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে বাংলা ভাষাকে অবহেলা করা তিনি মেনে নিতে রাজি ছিলেন না।
১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্টও পাকিস্তানের গণপরিষদে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের রেকর্ড পাওয়া যায়। এসব বক্তব্যের ইংরেজি সরকারি রেকর্ড রয়েছে। তবে এখানে একটি গবেষণাগত সতর্কতা জরুরি। কোনো সংসদীয় কার্যবিবরণী ইংরেজিতে মুদ্রিত হয়েছে বলেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে বক্তা মুখে ইংরেজিতেই বক্তব্যটি দিয়েছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধুর কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্যকে ‘ইংরেজি ভাষণ’ হিসেবে উল্লেখ করার আগে সম্ভব হলে মূল অডিও, ভিডিও অথবা নথিতে বক্তৃতার ভাষা সম্পর্কে সরাসরি প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে বঙ্গবন্ধু ভাষার প্রশ্নে আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বাংলা ও উর্দুর পারস্পরিক বোঝাপড়ার সমস্যা তুলে ধরেন এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের ভাষাগত অধিকারের বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্যে বাংলা, উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু ও বালুচি ভাষার প্রসঙ্গ আসে। তিনি মূলত পাকিস্তানের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভাষার মর্যাদা ও বিকাশের প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলেন।
১৭ জানুয়ারি ১৯৫৬-এর গণপরিষদীয় আলোচনাতেও বাংলা ভাষার অধিকার নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। পাকিস্তানের গণপরিষদের কার্যক্রমে বাংলা ভাষাকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না- এ নিয়ে তিনি প্রতিবাদ করেন। বাংলা, উর্দু ও ইংরেজির সরকারি মর্যাদা এবং পরিষদের কার্যক্রমে বাংলার ব্যবহার নিয়ে তাঁর বক্তব্য ছিল ভাষার সমঅধিকারের দাবিরই অংশ।
বঙ্গবন্ধুর ভাষা-রাজনীতির সবচেয়ে প্রতীকী ও ঐতিহাসিক পরিণতি দেখা যায় ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে দাঁড়ালেন, তখন তিনি বিশ্বের প্রচলিত কূটনৈতিক ভাষার পরিবর্তে নিজের মাতৃভাষা বাংলাকেই বেছে নিলেন। এটি ছিল কেবল একটি ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; এর মধ্যে ছিল একটি সদ্য স্বাধীন জাতির আত্মপরিচয়, ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিজের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের আন্তর্জাতিক ঘোষণা।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘের মঞ্চ—এই দীর্ঘ পথের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। যে বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালিকে রক্ত দিতে হয়েছিল, সেই বাংলাই একদিন স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কের কণ্ঠে বিশ্বের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ফোরামে উচ্চারিত হয়েছিল।
তাই বঙ্গবন্ধুর ভাষণ নিয়ে ইতিহাস লিখতে হলে আবেগের পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতাও জরুরি। তিনি বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক কণ্ঠ ছিলেন- এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই। জাতিসংঘে বাংলায় তাঁর ভাষণও একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য এবং স্বীকৃত।
সেই সূত্র ধরে ধীরে ধীরে অর্থাৎ পরবর্তীতে এই বাংলা ভাষা ১৯৯৯ সালে ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ১৮৮টি দেশ সমর্থনে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। যার নেপথ্যে শেখের বেটির অবদান রয়েছে।
অতপর পরের বছর ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্যদেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। এখানে আরেকটি বিষয় গর্বের সাথে উল্লেখ করতে চাই- আমাদের কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরের দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম ছিলেন এই অর্জনের রূপকার।