বায়ু-শব্দ-বর্জ্য দূষণে বিপর্যস্ত নগরজীবন, সমাধানে স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, যানবাহনের চাপ, শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে পরিবেশগত সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বায়ু ও শব্দদূষণের পাশাপাশি দৃশ্যদূষণ, জলাবদ্ধতা এবং প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে।
ছবিতে থাকা একটি পরিবেশবিষয়ক নীতিগত প্রস্তাবনা ও সুপারিশে এসব সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বায়ুদূষণ সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি
নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পরিবেশগত সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ বায়ুদূষণ। শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজ ও রাস্তার ধুলা, ইটভাটা, যানবাহন এবং বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বাতাসে ক্ষতিকর কণা ও দূষক বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে মানুষের শ্বাসতন্ত্র, হৃদ্যন্ত্র ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় নির্মাণাধীন স্থানে নিয়মিত পানি ছিটানো, ধুলা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্দিষ্ট এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। মধ্যমেয়াদে নির্গমন পরীক্ষার পর যানবাহনের ফিটনেস সনদ প্রদান, কম সালফারযুক্ত জ্বালানি ব্যবহার এবং বায়ুমানের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সুপারিশ রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদে মাস্টারপ্ল্যানে বায়ুমান নীতি অন্তর্ভুক্ত করা, গ্রিন সিটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনসহ পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শব্দদূষণেও বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকা ও সড়কে অতিরিক্ত হর্ন, যানবাহনের শব্দ, নির্মাণকাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দ ব্যবহারের কারণে শব্দদূষণও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নথিতে শব্দদূষণকে মানুষের শ্রবণশক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম ও কর্মক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ সমস্যা মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন এবং হাইড্রোলিক হর্ন ও সাইরেনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব রয়েছে। মধ্যমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মোবাইল কোর্ট ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার এবং দীর্ঘমেয়াদে সাউন্ড ব্যারিয়ার, শব্দরোধী নকশা ও নগর পরিকল্পনায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ বাড়াচ্ছে জলাবদ্ধতা ও দৃশ্যদূষণ
নথিতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খোলা জায়গার সংকোচন, জলাধার দখল এবং অপর্যাপ্ত নগর ব্যবস্থাপনাকেও পরিবেশগত সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিলবোর্ড, পোস্টার, দেয়াললিখন ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে নগরের সৌন্দর্য ও স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদে অবৈধ পোস্টার ও বিলবোর্ড অপসারণ এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মধ্যমেয়াদে সমন্বিত Urban Design Guideline প্রণয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে Masterplan-এর আওতায় সবুজ নগর নেটওয়ার্ক তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণেও বড় হুমকি
নগর এলাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য ও প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হলেও এর একটি বড় অংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদভাবে অপসারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নদী-খালসহ জলাধারে গিয়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নথির সুপারিশে স্বল্পমেয়াদে নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার, মধ্যমেয়াদে Transfer Station, বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ এবং Recycling Plant স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে স্যানিটারি ল্যান্ডফিল, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন এবং বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা বা EPR কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব
পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় নথিতে স্বল্পমেয়াদে এক বছর, মধ্যমেয়াদে দুই থেকে তিন বছর এবং দীর্ঘমেয়াদে তিন থেকে পাঁচ বছরের পরিকল্পনার কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী, শুধু বড় প্রকল্প গ্রহণ করলেই পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং, জনসচেতনতা, নগর পরিকল্পনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশ রক্ষায় সরকারি সংস্থা, স্থানীয় সরকার, নগর কর্তৃপক্ষ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে ক্রমবর্ধমান বায়ু, শব্দ, বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে।