আধুনিক সড়ক, উন্নত প্রযুক্তি—তবুও থামছে না মৃত্যুর মিছিল

বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক ও দুর্বল আইন প্রয়োগই বড় চ্যালেঞ্জ; সমন্বিত উদ্যোগের দাবি
দেশে প্রতিদিনই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। কোথাও বাসের চাপায় প্রাণ যাচ্ছে পথচারীর, কোথাও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ঝরে পড়ছে তরুণের প্রাণ। আবার কোনো কোনো দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হচ্ছেন। প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা ও সড়ক অবকাঠামো আগের তুলনায় অনেক উন্নত হলেও সড়কে মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না।

বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি—২ হাজার ৬৭১ জন।

চলতি ২০২৬ সালেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। শুধু জুন মাসেই ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত ও ৫৬১ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সড়ক নিরাপত্তা ফাউন্ডেশন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে শুধু সড়কের অবস্থা দায়ী নয়। বেপরোয়া ও অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন অমান্য, চালকের অসাবধানতা, পথচারীদের অসচেতনতা এবং দুর্বল সড়ক ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
ঢাকা শহরের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে রাজধানীতে ৪০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৯ জন নিহত ও ৫১১ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এত সুযোগ থাকার পরও কেন দুর্ঘটনা কমছে না?
প্রশ্ন উঠছে, বর্তমানে সড়কে সিসিটিভি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ট্রাফিক সিগন্যাল, আধুনিক মহাসড়ক, উন্নত যানবাহন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি থাকার পরও কেন দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না?
এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা যায় আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রেই চালকের বেপরোয়া গতি বা ট্রাফিক আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। একই সঙ্গে লাইসেন্স প্রদান, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোরতা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনা কমাতে যা করা জরুরি
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে শুধু দুর্ঘটনার পর মামলা বা জরিমানা নয়, বরং দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে স্বয়ংক্রিয় স্পিড ক্যামেরা বাড়াতে হবে।
বেপরোয়া গতির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স পরীক্ষাকে আরও কঠোর করতে হবে।
মহাসড়কে পৃথক লেন, নিরাপদ ইউটার্ন ও পর্যাপ্ত সড়কচিহ্ন নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে হবে।
পথচারীদের জন্য নিরাপদ ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং ও প্রয়োজনীয় ফুটওভারব্রিজ নিশ্চিত করতে হবে।
মোটরসাইকেল চালকদের হেলমেট ও গতিসীমা মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্ঘটনার দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসার জন্য মহাসড়কভিত্তিক জরুরি সেবা জোরদার করতে হবে
শুধু চালক নয়, দায় নিতে হবে পুরো ব্যবস্থাকে
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালককে এককভাবে দায়ী করে সমস্যার সমাধান হবে না। চালক, গাড়ির মালিক, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, ট্রাফিক পুলিশ এবং পথচারী—সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
সড়কে একটি প্রাণহানি মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।

তাই এখন সময় এসেছে দুর্ঘটনার পর “কেন দুর্ঘটনা ঘটল”—এই প্রশ্নের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আগেই “কীভাবে দুর্ঘটনা ঠেকানো যায়”—এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার।